জাপানের জাতীয় ফল ‘পার্সিমন’ চাষে চৌগাছার জুলফিকারের বাজিমাত
যশোর অফিস
গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে আছে কমলা-হলুদ রঙের ফল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছে যেন পাকা টমেটো কিংবা গাব ঝুলছে। বিরল ও বিদেশি এই ফলটির নাম ‘পার্সিমন’—যা জাপানের জাতীয় ফল হিসেবে পরিচিত। বিদেশি এই ফলের বাণিজ্যিক চাষ করে সাফল্য ও স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার স্বরূপদাহ ইউনিয়নের হিজলী গ্রামের নার্সারি উদ্যোক্তা জুলফিকার আলী সিদ্দীক।
উদ্যোক্তা জুলফিকার বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে আমি নার্সারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার তাগিদেই ২০২১ সালে নাটোর হর্টিকালচার সেন্টার থেকে ২২ হাজার টাকা দিয়ে তিনটে পারসিমনের চারা কিনে নিয়ে আসি। সেই চারাগুলো খুব ভালো ছিলো না। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ যথেষ্ট বরকত হয়েছে, এক বছরের মধ্যে ফল আসা শুরু হয়। এ পর্যন্ত প্রতিবছর ফল আসছে। কিন্তু দুই বছর কোন ফল বিক্রি হয়নি। মানুষ শুধু এসেছে, খেয়ে দেখেছে, যার মত সে মত প্রকাশ করেছে। কেউ বলেছে এ ফল খাওয়া যায় না, কেউ বলেছে এ ফল মোটামুটি ভালো, কেউ বলেছে খুব ভালো।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক গবেষণায় সাফল্য পেয়ে ২০২৩ সালে নিজের গাছ থেকে কলম তৈরি করে ৩০টি চারা নিয়ে ৫ কাঠা জমিতে বাগান সম্প্রসারণ করেছি। দীর্ঘ পরিচর্যার পর বর্তমানে আমার বাগানের ২১টি গাছে থোকায় থোকায় ফলন এসেছে।
টমেটোর মতো দেখতে অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ‘পার্সিমন’ বা ‘কাকি’ ফলের ভেতরে কোনো বীজ থাকে না এবং খোসাসহ খাওয়া যায়। গড়ে কেজিতে ৬ থেকে ৭টি ফল ধরে। স্থানীয় বাজারে নতুন ও দুর্লভ এই ফল প্রতি কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
জুলফিকার আলী সিদ্দীকের আশা, চলতি মৌসুমে তিনি এই বাগান থেকে প্রায় ১৭ মণ ফল বিক্রি করতে পারবেন। এতে ফল বিক্রি থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা এবং চারা বিক্রি থেকে আরও ১০ লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, পার্সিমন ফলের একটাই বৈশিষ্ট্য যে এ বিনা যত্নে হয়। যে পরিচর্যা করতে পারবে না সেও ভালো ফলন পাবে। তাছাড়া এই ফলটা আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। বাইরের দেশের মূল সিজনটা ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে। আর আমাদের এটা আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ফল আসে। সে ক্ষেত্রে আমাদের ফলটা বাজারজাত করায় কোন সমস্যা তৈরি হবে না। ফলে আশা করছি দেশে উৎপাদিত পার্সিমন ফল ভালো দামে বিক্রি করা যাবে। এজন্য আমার বাগান আরো সম্প্রষারণ করার ইচ্ছা আছে।
বাগানে আসা দর্শনার্থী এম আর মাসুদ বলেন, দেশের মাটিতে বিদেশি ও দুর্লভ ফলের এমন বাম্পার ফলন দেখে আমি মুগ্ধ। ঢাকা কিংবা দূর-দূরান্তের নার্সারিতে চারা ও ফলের উচ্চমূল্য থাকায় অনেকেই সেখান থেকে খালি হাতে ফিরেছিলেন। এখন হিজলী গ্রামের এই বাগানে এসে সরাসরি ফল দেখে ও স্বাদ নিয়ে উৎসাহিত হয়ে নতুন অনেকেই চারা সংগ্রহ করে ছাদবাগান বা বাণিজ্যিক বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
বাগান পরিদর্শনে এসেছিলেন সজিব আহমেদ নামে এক ব্যাংকার। তিনি বলেন, জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে যখন আমেরিকা অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করছিল, সেই সময় ধ্বংসস্তূপের মাঝখান থেকে একটি গাছের চারা অঙ্কুরিত হয়েছিল। সেটা হলো পারসিমন। এই গাছের স্থায়িত্ব ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ফলের কারণে জাপানিরা এটাকে তাদের জাতীয় ফল হিসেবে বিবেচনা করে। আমাদের দেশে এখন নতুন করে চাষ হচ্ছে। জুলফিকার চাচার এই বাগান দেখে অভিভূত হলাম এবং এগুলো আমাদের আরও সহজলভ্যভাবে চাষ হওয়া দরকার। কারণ আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পুষ্টি বাড়ানোর জন্য এ ধরনের ফল সহজলভ্য হওয়া উচিত।
এদিকে জুলফিকারের এই পার্সিমন বাগান ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, অত্যন্ত পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এই বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ক্ষেত্র বেশ উজ্জ্বল। অনেকে চারা সংগ্রহ করে বাগান করছে। পার্সিমনের চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
