মূল কন্টেন্টে যান
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ

পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্কের করুণ পরিণতি নারীর

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পঠিত: ১ বার

গাজীপুরে লাগেজ ও প্লাস্টিকের বস্তা থেকে উদ্ধার হওয়া নারীর খণ্ডিত মরদেহের পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের প্রেমিক, তার মা ও এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পিবিআই জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন,বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মাসকুর আলমের ছেলে মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) এবং মিজানুর রহমান মিল্টন (২৪)।

নিহত নারীর নাম ডলি আক্তার (৩০)। তিনি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা (মেম্বারবাড়ি) এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্থানীয় বাঘেরবাজার এলাকার গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাজীপুর মহানগরীর রাজদীঘির উত্তর পাড়ে পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান গাজীপুর জেলা পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার।

পিবিআই জানায়, পোশাক কারখানায় চাকরি করার সময় মিশন ইসলামের সঙ্গে ডলির পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের সম্পর্ক চলছিল। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।

তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান আনসারী জানান, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু আক্তার পাশের কক্ষে ঘুমাতে যান। মিশন ও ডলি একই কক্ষে ছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় ডলির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন মিশন।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতে মিশন ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ান। ডলি ঘুমিয়ে পড়ার পর রাত আনুমানিক ২টার দিকে লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর মরদেহটি ঘরের চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির মরদেহ দেখতে পান। এরপর মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন মিশন।

মরদেহ গুম করতে একটি স্যুটকেস কেনা হলেও মরদেহটি তাতে না ধরায় ব্লেড, বঁটি ও দা দিয়ে কোমর থেকে মরদেহ দ্বিখণ্ডিত করা হয়। পরে কোমরের নিচের অংশ লাগেজে এবং ওপরের অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।

এরপর মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনেন। মিল্টন এসে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন।

পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় করে রাজেন্দ্রপুর এলাকায় যান। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে তারা ভবানীপুর এলাকায় পৌঁছান। ভবানীপুর ব্রিজ এলাকায় মিশন ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তা কালভার্টের নিচের খালের পানিতে ফেলে দেন।

এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লেগে যায়। তিনি মিশনের কাছে বস্তা ও লাগেজের ভেতরে কী রয়েছে জানতে চান। তখন মিশন তাকে জানান, সেখানে তার প্রেমিকা ডলি আক্তারের মরদেহ রয়েছে। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান।

এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকায় হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেড পোশাক কারখানার উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের খাল থেকে একটি লাগেজ ও প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়।

লাগেজের ভেতরে ছিল মরদেহের কোমরের নিচের অংশ। আর কোমরের ওপরের অংশ ছিল প্লাস্টিকের বস্তায়। মরদেহটি অজ্ঞাত এবং অর্ধগলিত অবস্থায় থাকায় শুরুতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পরে ধারাবাহিক অনুসন্ধান, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করে পিবিআই। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদেরও শনাক্ত করা হয়।

ডলি হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই সোহেল (৪৪) গত ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে গণমাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশিত হলে পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, শনিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মিজানুর রহমান মিল্টনকে এবং একই দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে গাজীপুর সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর (তুলসিভিটা) এলাকার পৃথক ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামিদের দেওয়া তথ্য ও তাদের দেখানো স্থান অনুযায়ী মিশনের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মরদেহ খণ্ডিত করার কাজে ব্যবহৃত একটি বঁটি ও দা, ডলি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও একজোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া মরদেহ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, লাগেজ কেনার বিষয়ে তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পিবিআই।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার বলেন, অজ্ঞাত ও পচনশীল মরদেহ হওয়ায় শুরুতে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। তবে ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত সোর্সের সমন্বিত ব্যবহারে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, ঘটনার অন্যান্য দিক এবং উদ্ধার হওয়া আলামত নিয়েও তদন্ত চলছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *