চণ্ডিপাশা ইউনিয়নে আগাম জাতের শিম চাষে কৃষকের বাজিমাত
এ জেড আল মুজাহিদ কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:- মৌসুমের আগেই সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে শিম, আর তাতেই কৃষকের মুখে হাসির ঝিলিক। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের চণ্ডিপাশা চরপাড়ার মাঠে এখন প্রতিদিন ভোরে শুরু হয় এক অন্যরকম কর্মব্যস্ততা। কারো হাতে বাঁশের ঝুড়ি, কারো হাতে শিম তোলার ব্যাগ—মাচা থেকে শিম তোলার পর চলে বাছাই, ওজন আর বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি। অল্প জমি, স্বল্প খরচ আর মৌসুমের আগেই বাজারে নতুন শিম তুলতে পারায় আকাশচুম্বী দামের প্রত্যাশায় এই জনপদের কৃষকদের কাছে আগাম শিম এখন কেবল কোনো পরীক্ষামূলক ফসল নয়, বরং বাড়তি আয়ের অন্যতম প্রধান ভরসা ও সফলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এই সাফল্যের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন স্থানীয় এক সফল কৃষক। তিনি মাত্র ২০ শতক জমিতে আগাম শিম চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এতে তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার টাকা। এর মধ্যেই তিনি প্রায় ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি করে ফেলেছেন এবং জমিতে থাকা অবশিষ্টাংশ থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার শিম বিক্রির জোরালো আশা করছেন। সব মিলিয়ে ২০ শতক জমি থেকে তার সম্ভাব্য মোট বিক্রি দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, যেখানে খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। প্রায় সাত বছর ধরে নিয়মিত এই লাভজনক চাষের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই কৃষক জানান, অন্য ফসলের তুলনায় আগাম শিমে দ্রুত ফলন আসে এবং বাজারে সরবরাহ কম থাকায় আশানুরূপ চড়া দাম পাওয়া যায়।
তাঁর দেখাদেখি একই গ্রামের আরেক উদ্যোগী কৃষক ৩৫ শতক জমিতে শিমের মাচা তৈরি করে দেখিয়েছেন আরেকটি সাফল্যের রূপরেখা। তাঁর ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচের বিপরীতে ইতোমধ্যে ৩০ হাজার টাকার শিম বিক্রি হয়েছে এবং ক্ষেতে থাকা বাকি শিম থেকে আরও প্রায় ২ লাখ টাকার বিক্রির আশা করছেন তিনি। সব মিলিয়ে তার মোট বিক্রি প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং খরচ বাদে নিট লাভ প্রায় ২ লাখ ১৪ থেকে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। প্রায় এক দশক ধরে আগাম শিম চাষ করা এই কৃষকের মতে, সঠিক বাজার ধরতে পারলে ঝুঁকি থাকলেও লাভের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
চণ্ডিপাশা চরপাড়ায় এই আগাম শিম চাষের ইতিহাস শুরু হয়েছিল প্রায় আট-দশ বছর আগে। সে সময় পাবনা থেকে সংগৃহীত বীজ দিয়ে কয়েকজন কৃষকের পরীক্ষামূলক চাষের মাধ্যমে যে স্বপ্নের বীজ বপন করা হয়েছিল, আজ তা সাফল্যের মহীরূহে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে কৃষকেরা শুধু বাইরে থেকে বীজ আনেন না, বরং নিজেদের সেরা গাছগুলো থেকে বীজ সংরক্ষণ করে খরচ কমানোর পাশাপাশি এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই উচ্চ ফলন নিশ্চিত করছেন।
এর পাশাপাশি উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের তত্ত্বাবধানে এবং নিয়মিত কারিগরি সহায়তায় কৃষকেরা রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন করে আসছে। তাছাড়া পাকুন্দিয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি বিভাগ কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন সবজি প্রণোদনা, বীজ ও সার বিতরণ কৃষকদের এই সাফল্যে এক নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
আজ চণ্ডিপাশা চরপাড়ার মাঠজুড়ে কেবল মাচার পর মাচা আর কৃষকদের হাসিমুখের সোনালী ভবিষ্যৎ উঁকি দিচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, ঋতুভিত্তিক বাজার চাহিদা এবং কৃষকদের অদম্য পরিশ্রমে ছোট একটি জমিও যে ভাগ্যবদলের অনুঘটক হতে পারে, তার বস্তব প্রমাণ মাঠে এই শিম চাষ। মাচায় ঝুলে থাকা প্রতিটি সবুজ শিমের সঙ্গে তাই পাকুন্দিয়ার কৃষকেরা বুনছেন সমৃদ্ধির নতুন রঙ্গিন স্বপ্ন।
