৫০ হাজার মানুষ মৌলভীবাজারে টিলা ধসের ঝুঁকিতে 

  • Reporter Name
  • Update Time : 09:53:42 am, Sunday, 19 July 2026
  • 22 Time View
তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
টিলাধসের ঝুঁকিতে ৫০ হাজার মানুষ টিলার কিছু অংশ এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। তবু ঝুঁকি নিয়ে থাকছে একটি পরিবার। গতকাল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া এলাকায়।
বর্ষা এলেই মৌলভীবাজারের টিলা-পাহাড়ঘেরা জনপদে নেমে আসে আতঙ্ক। তবু ঝুঁকি নিয়ে এসব স্থানে বসবাস করছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চার বছরে টিলাধসে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসনে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালিত হলেও টিলা কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি বর্ষায় ভারী বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে টিলাধস ও প্রাণহানি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় টিলা ভূমি রয়েছে। এসব টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। তবে সারা বছর জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে টিলা কাটা হচ্ছে। ফলে বর্ষা এলেই টিলা ধসে পড়ে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মহাজিরাবাদ ও কমলগঞ্জের কালেঙ্গায় টিলাধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিয়মিত তৎপরতা না থাকায় টিলা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। আর এতে ঝুঁকি বাড়ছে টিলার ওপর ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের। বৃষ্টি হলে টিলাধসের শঙ্কা দেখা দেয়। ভারী বৃষ্টি হলে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া এবং এর আশপাশে টিলার বাসিন্দা সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ, জয়ন্তী তাঁতী বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড়ধসে ঘর ভাঙে, তবু যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এবারও বসতির পাশের পাহাড়ে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে সবকিছু। সমতলে থাকার জায়গা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েও আমরা থাকছি। আমাদের পাশের টিলায় তিন বছর আগে ধসে চারজন মারা যায়। আমাদের টিলার মাটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা-বাগানে টিলা ধসে চার নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছর কুলাউড়ার ভাটেরায় পাহাড়ধসে একই গ্রামের ৩ শিশু এবং চাতলাপুর চা-বাগানে আরও এক নারী মারা যান। ২০২৪ সালের কমলগঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালেঞ্জি খাসিয়াপুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলাধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহস্থালির কাজের জন্য টিলার মাটি আনতে গিয়ে মাটি চাপায় এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘যারা টিলা কাটে, তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ—দুটির ক্ষতি করছে। প্রকৃতিকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত এসব বিষয় শক্তভাবে প্রতিহত করা। টিলাগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। টিলা কাটার প্রভাবে নিয়মিত টিলা ধসে পড়ছে, এমনকি এসব টিলাধসের ঘটনায় প্রতিবছর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।’
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন,‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। টিকা কাটার অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্ষার শুরু থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, টিলাধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালানো হচ্ছে।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয়

১ কোটি ৭০ লাখের ঘরে পরীমণি, পিছিয়ে গেল সাকিব

৫০ হাজার মানুষ মৌলভীবাজারে টিলা ধসের ঝুঁকিতে 

Update Time : 09:53:42 am, Sunday, 19 July 2026
তিমির বনিক,মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
টিলাধসের ঝুঁকিতে ৫০ হাজার মানুষ টিলার কিছু অংশ এরই মধ্যে ধসে পড়েছে। তবু ঝুঁকি নিয়ে থাকছে একটি পরিবার। গতকাল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া এলাকায়।
বর্ষা এলেই মৌলভীবাজারের টিলা-পাহাড়ঘেরা জনপদে নেমে আসে আতঙ্ক। তবু ঝুঁকি নিয়ে এসব স্থানে বসবাস করছে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত চার বছরে টিলাধসে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এরপরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসনে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতা ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালিত হলেও টিলা কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতি বর্ষায় ভারী বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে টিলাধস ও প্রাণহানি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, কুলাউড়া ও সদর উপজেলায় টিলা ভূমি রয়েছে। এসব টিলা ও পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকি নিয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অন্তত ৫০ হাজার মানুষ বসবাস করে। তবে সারা বছর জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে টিলা কাটা হচ্ছে। ফলে বর্ষা এলেই টিলা ধসে পড়ে। শ্রীমঙ্গলের রাধানগর, মহাজিরাবাদ ও কমলগঞ্জের কালেঙ্গায় টিলাধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিয়মিত তৎপরতা না থাকায় টিলা থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। আর এতে ঝুঁকি বাড়ছে টিলার ওপর ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের। বৃষ্টি হলে টিলাধসের শঙ্কা দেখা দেয়। ভারী বৃষ্টি হলে আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া এবং এর আশপাশে টিলার বাসিন্দা সবিতা তাঁতী, শশী তাঁতী, ফ্রান্সিস কন্দ, জয়ন্তী তাঁতী বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষায় পাহাড়ধসে ঘর ভাঙে, তবু যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। এবারও বসতির পাশের পাহাড়ে দেখা দিয়েছে বড় ফাটল। যেকোনো মুহূর্তে ধসে যেতে পারে সবকিছু। সমতলে থাকার জায়গা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েও আমরা থাকছি। আমাদের পাশের টিলায় তিন বছর আগে ধসে চারজন মারা যায়। আমাদের টিলার মাটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে, যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৯ আগস্ট শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালীঘাট ইউনিয়নের লাখাইছড়া চা-বাগানে টিলা ধসে চার নারী শ্রমিকের মৃত্যু হয়। একই বছর কুলাউড়ার ভাটেরায় পাহাড়ধসে একই গ্রামের ৩ শিশু এবং চাতলাপুর চা-বাগানে আরও এক নারী মারা যান। ২০২৪ সালের কমলগঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালেঞ্জি খাসিয়াপুঞ্জিতে কাজ করার সময় টিলাধসে এক নারীর মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গৃহস্থালির কাজের জন্য টিলার মাটি আনতে গিয়ে মাটি চাপায় এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘যারা টিলা কাটে, তারা পরিবেশ ও প্রতিবেশ—দুটির ক্ষতি করছে। প্রকৃতিকে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত এসব বিষয় শক্তভাবে প্রতিহত করা। টিলাগুলো রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। টিলা কাটার প্রভাবে নিয়মিত টিলা ধসে পড়ছে, এমনকি এসব টিলাধসের ঘটনায় প্রতিবছর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।’
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাঈদুল ইসলাম বলেন,‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া টিলা কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। টিকা কাটার অভিযোগ পেলে আমরা অভিযান পরিচালনা করি।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্ষার শুরু থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, টিলাধসে প্রাণহানিসহ বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি জনপদে সচেতনতামূলক প্রচার অভিযান চালানো হচ্ছে।