শিশু আয়নী হত্যা মামলার রায়ে একমাত্র আসামী রুবেলের মৃত্যুদন্ড

  • Reporter Name
  • Update Time : 04:02:57 pm, Monday, 20 July 2026
  • 8 Time View
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত আয়নী ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে একমাত্র আসামি রুবেলের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল-২ বিচারক সাইফুর রহমান।
১০ বছরের ফুটফুটে শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী (আঁখি মনি)। তিন বছর আগে বিড়াল ছানার লোভ দেখিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ময়লার স্তুপে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। আট দিন পর শিশুটির মা আদালতের দ্বারস্থ হলে পচে গলে যাওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে পিবিআই।
সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট ও ২৪ জন সাক্ষীর অকাট্য প্রমাণে আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আবিদা সুলতানা আইনি হত্যা মামলা যাতে ২য় বার নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) ও দন্ডবিধি ৩০২, ২০১ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানার কাজীর দিঘি এলাকার বাসা থেকে আরবি পড়তে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সী আবিদা সুলতানা আয়নী ওরফে আঁখি মনি। নিখোঁজের ৮ দিনেও তার কোন সন্ধান না পাওয়ায় একজন বড় পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় শিশুটির মা যোগাযোগ করেন বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ।
অতঃপর ঘটনার ৮ দিনের মাথায় ২৮ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক শারমিন জাহানের আদালতে আসামি মো. রুবেল বিড়াল ছানা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে আবিদা সুলতানা আয়নীকে অপহরণ করার অভিযোগে শিশুটির মা বিবি ফাতেমা বাদী হয়ে মামলা করলে আদালত পাহাড়তলী থানার ওসিকে এজাহার হিসেবে নিতে নির্দেশ দেন। ওইদিন রুবেলকে আটকের পরই তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে ২৯ মার্চ
ভোরে পার্শ্ববর্তী পুকুরপাড়া মুরগি ফার্ম এলাকার একটি জলাশয় থেকে আয়নীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পিবিআই।
জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল আঁখি মনিকে বিড়ালছানার প্রলোভন দেখিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি খালি ভবনের চতুর্থ তলায় নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে এবং পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন ও বিচার কার্যক্রম : দীর্ঘ তদন্তের পর বিগত ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মামলায় পিবিআই এর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে এই ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দাখিলসহ নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(২) ও দন্ডবিধির ২০১ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর এই মামলার একমাত্র আসামি মো. রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক।
২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, জব্দ তালিকার সাক্ষী, ডাক্তার, আসামীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট সহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা রয়েছেন।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল এর বিচারক নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) এবং দন্ডবিধির ৩০২/২০১ ধারায় মামলাটিতে পুনরায় চার্জ গঠন করেন।
সাক্ষ্য গ্রহণ ও আর্গুমেন্ট শুনানীর পর মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।
ঘটনার ৮দিন পর উদ্ধার হওয়ায় আয়নীর উদ্ধারকৃত লাশে পচন ধরায় সুরতহাল প্রতিবেদনে ধর্ষণের সরাসরি আলামত পাওয়া যায়নি।
ঘটনার আগের দিনের সিসিটিভি ফুটেজে আয়নি কে আসামি সবজি বিক্রেতা রুবেলের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায়। রুবেল তাকে বিড়ালছানা দেয়ার লোভ দেখাচ্ছিল। পরের দিনের সিসিটিভির ফুটেছে দেখা যায় বোরকা পরে আয়নী ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় তার এক সহপাঠীকেও বলছে সে বিড়াল ছানার জন্য যাচ্ছে।
তদন্ত সংস্থা পিবিআই এর জিজ্ঞাসাবাদে আসামী রুবেল আয়নীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুম করার কথা স্বীকার করলেও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানায়, আয়নীকে জোরাজোরি করে ধর্ষণ করতে গিয়ে বীর্য বের হয়ে যায় এবং আয়নী চিৎকার করলে গলা টিপে হত্যা করা হয় এবং পরে লাশটি গুম করা হয়।
মামলায় ধর্ষণের ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী নাই তবে লাশ উদ্ধারের সময়ের সাক্ষী আছে। আয়নীর লাশ উদ্ধারের সময় আসামি রুবেল সহ বেশিরভাগ সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন বলে আদালতে তাদের জবানবন্দী ও জেরাতে জানান।
এই মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন,সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমার ওকালতি জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন এটা।
সাড়ে তিন বছরের পরিশ্রম সার্থক হলো। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে একটানা লেগেছিলাম এই শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের আশায়।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

জোড়ালো হচ্ছে ইরানে স্থল হামলা চালানোর যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা

শিশু আয়নী হত্যা মামলার রায়ে একমাত্র আসামী রুবেলের মৃত্যুদন্ড

Update Time : 04:02:57 pm, Monday, 20 July 2026
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত আয়নী ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে একমাত্র আসামি রুবেলের মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত। সোমবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল-২ বিচারক সাইফুর রহমান।
১০ বছরের ফুটফুটে শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী (আঁখি মনি)। তিন বছর আগে বিড়াল ছানার লোভ দেখিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ময়লার স্তুপে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। আট দিন পর শিশুটির মা আদালতের দ্বারস্থ হলে পচে গলে যাওয়া শিশুটিকে উদ্ধার করে পিবিআই।
সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট ও ২৪ জন সাক্ষীর অকাট্য প্রমাণে আসামির অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, আবিদা সুলতানা আইনি হত্যা মামলা যাতে ২য় বার নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) ও দন্ডবিধি ৩০২, ২০১ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানার কাজীর দিঘি এলাকার বাসা থেকে আরবি পড়তে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সী আবিদা সুলতানা আয়নী ওরফে আঁখি মনি। নিখোঁজের ৮ দিনেও তার কোন সন্ধান না পাওয়ায় একজন বড় পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় শিশুটির মা যোগাযোগ করেন বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ।
অতঃপর ঘটনার ৮ দিনের মাথায় ২৮ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক শারমিন জাহানের আদালতে আসামি মো. রুবেল বিড়াল ছানা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে আবিদা সুলতানা আয়নীকে অপহরণ করার অভিযোগে শিশুটির মা বিবি ফাতেমা বাদী হয়ে মামলা করলে আদালত পাহাড়তলী থানার ওসিকে এজাহার হিসেবে নিতে নির্দেশ দেন। ওইদিন রুবেলকে আটকের পরই তার স্বীকারোক্তি ও দেখানো মতে ২৯ মার্চ
ভোরে পার্শ্ববর্তী পুকুরপাড়া মুরগি ফার্ম এলাকার একটি জলাশয় থেকে আয়নীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করে পিবিআই।
জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল আঁখি মনিকে বিড়ালছানার প্রলোভন দেখিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি খালি ভবনের চতুর্থ তলায় নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে এবং পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন।
তদন্ত প্রতিবেদন ও বিচার কার্যক্রম : দীর্ঘ তদন্তের পর বিগত ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মামলায় পিবিআই এর তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে এই ঘটনার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দাখিলসহ নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯(২) ও দন্ডবিধির ২০১ ধারায় চার্জশিট দাখিল করেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর এই মামলার একমাত্র আসামি মো. রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক।
২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। যার মধ্যে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, জব্দ তালিকার সাক্ষী, ডাক্তার, আসামীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট সহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা রয়েছেন।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল এর বিচারক নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) এবং দন্ডবিধির ৩০২/২০১ ধারায় মামলাটিতে পুনরায় চার্জ গঠন করেন।
সাক্ষ্য গ্রহণ ও আর্গুমেন্ট শুনানীর পর মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।
ঘটনার ৮দিন পর উদ্ধার হওয়ায় আয়নীর উদ্ধারকৃত লাশে পচন ধরায় সুরতহাল প্রতিবেদনে ধর্ষণের সরাসরি আলামত পাওয়া যায়নি।
ঘটনার আগের দিনের সিসিটিভি ফুটেজে আয়নি কে আসামি সবজি বিক্রেতা রুবেলের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায়। রুবেল তাকে বিড়ালছানা দেয়ার লোভ দেখাচ্ছিল। পরের দিনের সিসিটিভির ফুটেছে দেখা যায় বোরকা পরে আয়নী ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় তার এক সহপাঠীকেও বলছে সে বিড়াল ছানার জন্য যাচ্ছে।
তদন্ত সংস্থা পিবিআই এর জিজ্ঞাসাবাদে আসামী রুবেল আয়নীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুম করার কথা স্বীকার করলেও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানায়, আয়নীকে জোরাজোরি করে ধর্ষণ করতে গিয়ে বীর্য বের হয়ে যায় এবং আয়নী চিৎকার করলে গলা টিপে হত্যা করা হয় এবং পরে লাশটি গুম করা হয়।
মামলায় ধর্ষণের ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী নাই তবে লাশ উদ্ধারের সময়ের সাক্ষী আছে। আয়নীর লাশ উদ্ধারের সময় আসামি রুবেল সহ বেশিরভাগ সাক্ষী উপস্থিত ছিলেন বলে আদালতে তাদের জবানবন্দী ও জেরাতে জানান।
এই মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন,সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমার ওকালতি জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন এটা।
সাড়ে তিন বছরের পরিশ্রম সার্থক হলো। মামলা দায়ের থেকে শুরু করে একটানা লেগেছিলাম এই শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের আশায়।