বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের উগান্ডাসহ পাঁচ দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা

  • Reporter Name
  • Update Time : 01:34:37 pm, Monday, 27 July 2026
  • 3 Time View

ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আফ্রিকাসহ অন্যান্য মহাদেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে সাময়িকভাবে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের পাঁচ দেশ জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসের যৌথ এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে উগান্ডা, কেনিয়া বা রুয়ান্ডার মতো তৃতীয় কোনো দেশে তৈরি হওয়া সাময়িক শিবিরে ঠাঁই হতে পারে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নীতি নির্ধারকদের সুত্রে জানা গেছে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন নিয়মকে সামনে রেখে পাঁচ দেশের জোট এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপ ভূখণ্ডের বাইরে তথাকথিত ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে স্বাগতিক হিসেবে প্রাথমিক তালিকায় রাখা হয়েছে উগান্ডা, কেনিয়া, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া ও উজবেকিস্তানকে। এসব দেশের সরকারের সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা প্রাথমিক পর্যায় আলোচনা চালাচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি হয়নি।

এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, চলতি বছরই তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে এসব রিটার্ন হাবে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

এতদিন আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জটিলতার সুযোগ নিয়ে অনেকে ইউরোপেই থেকে যেতেন। তবে উগান্ডাসহ আফ্রিকান দেশগুলোতে হাব তৈরি হলে আবেদন বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সরাসরি ইউরোপ থেকে সেসব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের পাঁচ দেশের উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার ইউরোপে খুবই কম। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের স্বীকৃতির হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তিনি জানান, নতুন রেগুলেশন অনুমোদিত হলে নতুন আশ্রয় আবেদন প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে যাদের বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কমকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে থেকেই যান। রিটার্ন হাব চালু হলে এই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা।

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বাংলাদেশের নাগরিকদের এখন রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। সরকার সবসময় অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।’

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

জোড়ালো হচ্ছে ইরানে স্থল হামলা চালানোর যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা

বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের উগান্ডাসহ পাঁচ দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা

Update Time : 01:34:37 pm, Monday, 27 July 2026

ইউরোপীয় ইউনিয়নে আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আফ্রিকাসহ অন্যান্য মহাদেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে সাময়িকভাবে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

ইউরোপের পাঁচ দেশ জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিসের যৌথ এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে উগান্ডা, কেনিয়া বা রুয়ান্ডার মতো তৃতীয় কোনো দেশে তৈরি হওয়া সাময়িক শিবিরে ঠাঁই হতে পারে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নীতি নির্ধারকদের সুত্রে জানা গেছে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন নিয়মকে সামনে রেখে পাঁচ দেশের জোট এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপ ভূখণ্ডের বাইরে তথাকথিত ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে স্বাগতিক হিসেবে প্রাথমিক তালিকায় রাখা হয়েছে উগান্ডা, কেনিয়া, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া ও উজবেকিস্তানকে। এসব দেশের সরকারের সঙ্গে ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা প্রাথমিক পর্যায় আলোচনা চালাচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি হয়নি।

এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে গ্রিস। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, চলতি বছরই তৃতীয় দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর থেকেই রিটার্ন হাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং যাদের তাৎক্ষণিকভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না, তাদের সাময়িকভাবে এসব রিটার্ন হাবে রাখা হবে। পরে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

এতদিন আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জটিলতার সুযোগ নিয়ে অনেকে ইউরোপেই থেকে যেতেন। তবে উগান্ডাসহ আফ্রিকান দেশগুলোতে হাব তৈরি হলে আবেদন বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সরাসরি ইউরোপ থেকে সেসব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রিটার্ন হাব নিয়ে ইউরোপের পাঁচ দেশের উদ্যোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি নীতিগত পর্যায়ে রয়েছে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের আশ্রয় আবেদন গ্রহণের হার ইউরোপে খুবই কম। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদনের স্বীকৃতির হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। তিনি জানান, নতুন রেগুলেশন অনুমোদিত হলে নতুন আশ্রয় আবেদন প্রায় ১২ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে। যেসব আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তি হলো, বর্তমানে যাদের বহিষ্কার বা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কমকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী ইউরোপে থেকেই যান। রিটার্ন হাব চালু হলে এই প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা।

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, বিচারিক প্রতিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইইউতে আশ্রয় আবেদনকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। ওই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের ৩৬ হাজার ৯০১টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। বাংলাদেশের নাগরিকদের এখন রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। সরকার সবসময় অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করে এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়।’

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে মানবাধিকারবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।’