যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে সব স্বর্ণ সরিয়ে নিল ফ্রান্স

  • Reporter Name
  • Update Time : 09:49:20 pm, Tuesday, 7 April 2026
  • 21 Time View

দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা নিজেদের সব স্বর্ণ অবশেষে সরিয়ে নিল ফ্রান্স। এটি কেবল একটি সাধারণ স্থানান্তর নয়, বরং অত্যন্ত সুনিপুণ এক আর্থিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ।

গত জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে ফ্রান্স তাদের ১২৯ টন স্বর্ণ নিউ ইয়র্ক থেকে প্যারিসে ফিরিয়ে এনেছে। আমেরিকান সংবাদমাধ্যমে নিউজউইক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

তবে এই স্বর্ণ সরাসরি জাহাজে বা বিমানে করে পরিবহন করার পরিবর্তে ব্যাংকটি এক অভিনব কেনাবেচার কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পুরনো ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যহীন সোনার বারগুলো সেখানে বিক্রি করে দিয়েছে এবং সেই সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে ইউরোপীয় বাজার থেকে আধুনিক ও উচ্চমানসম্পন্ন নতুন গোল্ড বুলিয়ন ক্রয় করে প্যারিসের নিজস্ব ভল্টে জমা করেছে।

এই বিশাল কার্যক্রমটি ফ্রান্সের জন্য অভাবনীয় আর্থিক সাফল্য বয়ে এনেছে। স্বর্ণের বর্তমান চড়া দামের সুযোগ নিয়ে মোট ২৬টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর ফলে বাঙ্ক দ্য ফ্রঁস প্রায় ১২.৮ বিলিয়ন ইউরো বা ১৩ বিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে। এই বিশাল অংকের আয় ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটি ৭.৭ বিলিয়ন ইউরো লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিল, সেখানে এই কৌশলগত স্বর্ণ বিক্রির বদৌলতে ২০২৫ সালে তারা ৮.১ বিলিয়ন ইউরো নিট মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মানোন্নয়ন থেকে আসা আয় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বিশেষ অবদান রেখেছে।

বাঙ্ক দ্য ফ্রঁস-এর গভর্নর ফ্রাঁসোয়া ভিলেরয় ডি গালহাউ এই পদক্ষেপের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত ছিল না বরং এটি ছিল একটি বাস্তবসম্মত কারিগরি ও আর্থিক সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার খাতিরে ফ্রান্সের একটি বড় অংশ স্বর্ণ ম্যানহাটনের ভল্টে রাখা হয়েছিল।

তবে বর্তমান বিশ্ববাজারে লেনদেনের সুবিধার্থে এবং তারল্য বজায় রাখতে আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ওজন, বিশুদ্ধতা ও শংসাপত্র) অনুসরণ করা অপরিহার্য। নিউ ইয়র্কে থাকা স্বর্ণগুলো সেই মানদণ্ড পূরণ করছিল না।

এখন প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড ভল্ট ‘লা সুতেরেইন’-এ ফ্রান্সের মোট ২ হাজার ৪৩৭ টন স্বর্ণের সবটুকুই একত্রিত করা হয়েছে, যা দেশটিকে স্বর্ণ মজুতে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রেখেছে।

ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এবং সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বিদেশের মাটিতে রাখা স্বর্ণ নিজের দেশে ফিরিয়ে আনছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশের মাটিতে সোনা মজুত রাখার এই প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফ্রান্স ২০০৫ সাল থেকেই পর্যায়ক্রমে তাদের স্বর্ণ মজুত আধুনিকায়ন করে আসছিল এবং নিউ ইয়র্কের এই সর্বশেষ মজুত সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করল।

২০২৮ সালের মধ্যে অবশিষ্ট ১৩৪ টন সোনার মানোন্নয়ন শেষ করার মাধ্যমে ফ্রান্স তাদের পুরো মজুতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে তুলবে।

এদিকে, জার্মানিও তাদের স্বর্ণের বড় একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় স্বর্ণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

মূলত বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের স্বর্ণ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার দিকে ঝুঁকছে।

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে আমেরিকা তাদের সহায়তা দেয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণ জমা রাখতে শুরু করে তারা, যা পরবর্তীতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

জোড়ালো হচ্ছে ইরানে স্থল হামলা চালানোর যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ থেকে সব স্বর্ণ সরিয়ে নিল ফ্রান্স

Update Time : 09:49:20 pm, Tuesday, 7 April 2026

দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে রাখা নিজেদের সব স্বর্ণ অবশেষে সরিয়ে নিল ফ্রান্স। এটি কেবল একটি সাধারণ স্থানান্তর নয়, বরং অত্যন্ত সুনিপুণ এক আর্থিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ।

গত জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির মধ্যে ফ্রান্স তাদের ১২৯ টন স্বর্ণ নিউ ইয়র্ক থেকে প্যারিসে ফিরিয়ে এনেছে। আমেরিকান সংবাদমাধ্যমে নিউজউইক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

তবে এই স্বর্ণ সরাসরি জাহাজে বা বিমানে করে পরিবহন করার পরিবর্তে ব্যাংকটি এক অভিনব কেনাবেচার কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পুরনো ও আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যহীন সোনার বারগুলো সেখানে বিক্রি করে দিয়েছে এবং সেই সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে ইউরোপীয় বাজার থেকে আধুনিক ও উচ্চমানসম্পন্ন নতুন গোল্ড বুলিয়ন ক্রয় করে প্যারিসের নিজস্ব ভল্টে জমা করেছে।

এই বিশাল কার্যক্রমটি ফ্রান্সের জন্য অভাবনীয় আর্থিক সাফল্য বয়ে এনেছে। স্বর্ণের বর্তমান চড়া দামের সুযোগ নিয়ে মোট ২৬টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে এই রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এর ফলে বাঙ্ক দ্য ফ্রঁস প্রায় ১২.৮ বিলিয়ন ইউরো বা ১৩ বিলিয়ন ইউরো সমপরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে। এই বিশাল অংকের আয় ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে যেখানে ব্যাংকটি ৭.৭ বিলিয়ন ইউরো লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিল, সেখানে এই কৌশলগত স্বর্ণ বিক্রির বদৌলতে ২০২৫ সালে তারা ৮.১ বিলিয়ন ইউরো নিট মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মানোন্নয়ন থেকে আসা আয় দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বিশেষ অবদান রেখেছে।

বাঙ্ক দ্য ফ্রঁস-এর গভর্নর ফ্রাঁসোয়া ভিলেরয় ডি গালহাউ এই পদক্ষেপের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত ছিল না বরং এটি ছিল একটি বাস্তবসম্মত কারিগরি ও আর্থিক সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরাপত্তার খাতিরে ফ্রান্সের একটি বড় অংশ স্বর্ণ ম্যানহাটনের ভল্টে রাখা হয়েছিল।

তবে বর্তমান বিশ্ববাজারে লেনদেনের সুবিধার্থে এবং তারল্য বজায় রাখতে আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ওজন, বিশুদ্ধতা ও শংসাপত্র) অনুসরণ করা অপরিহার্য। নিউ ইয়র্কে থাকা স্বর্ণগুলো সেই মানদণ্ড পূরণ করছিল না।

এখন প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড ভল্ট ‘লা সুতেরেইন’-এ ফ্রান্সের মোট ২ হাজার ৪৩৭ টন স্বর্ণের সবটুকুই একত্রিত করা হয়েছে, যা দেশটিকে স্বর্ণ মজুতে বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রেখেছে।

ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে এবং সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বিদেশের মাটিতে রাখা স্বর্ণ নিজের দেশে ফিরিয়ে আনছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশের মাটিতে সোনা মজুত রাখার এই প্রবণতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফ্রান্স ২০০৫ সাল থেকেই পর্যায়ক্রমে তাদের স্বর্ণ মজুত আধুনিকায়ন করে আসছিল এবং নিউ ইয়র্কের এই সর্বশেষ মজুত সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা তাদের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের একটি বড় ধাপ অতিক্রম করল।

২০২৮ সালের মধ্যে অবশিষ্ট ১৩৪ টন সোনার মানোন্নয়ন শেষ করার মাধ্যমে ফ্রান্স তাদের পুরো মজুতকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে তুলবে।

এদিকে, জার্মানিও তাদের স্বর্ণের বড় একটি অংশ নিজ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইউরোপীয় স্বর্ণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

মূলত বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং নিরাপত্তা বিবেচনায় ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের স্বর্ণ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার দিকে ঝুঁকছে।

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে আমেরিকা তাদের সহায়তা দেয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে স্বর্ণ জমা রাখতে শুরু করে তারা, যা পরবর্তীতে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।