মূল কন্টেন্টে যান
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ

পিতার জন্য দোয়া কামনা করেছেন ইটালি প্রবাসী, সৈয়দ আবুল মাকারিম

সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬ পঠিত: ১৩ বার

রুকন উদ্দিন,নেত্রকোণা

রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগীরা

বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনবান্ধব চিকিৎসক, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও নেত্রকোণার কেন্দুয়া থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মরহুম ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেকের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন মরহুমের ছোট ছেলে, বিশিষ্ট দানবীর, সমাজসেবক এবং ইতালিতে কর্মহীন বাঙালি প্রবাসীদের যিনি কাজের ব্যবস্থাসহ সকল কিছুর সুব্যবস্থা করে দেন ইতালিতে বাঙালি প্রবাসীদের আস্থা সৈয়দ আবুল মাকারিম।

১৯৮৯ সালের আজকের এই দিনে (২৪ অক্টোবর) রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির ডেন্টা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন, ডা. খালেক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

মরহুমের তাঁর ছোট ছেলে সৈয়দ আবুল মাকারিম পিতার জন্য দোয়া কামনা করে জানান, আমার পিতা মরহুম ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেক ছিলেন একাধারে একজন মানবিক চিকিৎসক, নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক, সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। মানুষের সেবা, দেশপ্রেম এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি তাঁর কর্মময় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে কেন্দুয়াসহ নেত্রকোনার রাজনৈতিক, সামাজিক ও চিকিৎসা অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। তিনি ১৯৩৮ সালের ২৭ জুলাই নেত্রকোণার মহকুমার অন্তর্গত তৎকালীন কেন্দুয়া থানার ১১ নম্বর চিরাং ইউনিয়নের গোপালাশ্রম গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ আলাউদ্দিন এবং মাতা তব্বতের নেছা

স্থানীয়দের মুখে সবসময় শুনেছি ছোটবেলা থেকেই আমার বাবা ছিলেন মেধাবী, কর্মঠ ও সমাজসচেতন। শিক্ষাজীবনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে তিনি তাড়াইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করেন।

সৈয়দ আবুল মাকারিম আরও জানান, আমার বাবা চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষা শেষ করার পর কর্মজীবনের শুরুতে তিনি খুলনায় চাকরিতে যোগদান করেন। সেখানে কিছুদিন দায়িত্ব পালনের পর সরকারি চাকরির আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের পাশে থেকে সরাসরি সেবা করার আকাঙ্ক্ষাই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। ফলে খুলনার চাকরি ছেড়ে তিনি নিজ এলাকা কেন্দুয়ায় ফিরে আসেন।
কেন্দুয়ায় ফিরে এসে তিনি চিকিৎসক হিসেবে সাধারণ মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। অসহায়, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক। চিকিৎসাকে তিনি শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের কল্যাণের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দেশের রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে ডাঃ সৈয়দ আব্দুল খালেক নিজেকে রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলন যখন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল, তখন তিনি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে কেন্দুয়া থানা আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং কেন্দুয়া থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় তিনি নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে দলীয় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দুয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, আমরা তাঁর মুখেই কতবার শুনেছি তার সত্য বলা স্মৃতির কথা। বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সংগঠক। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন কেন্দুয়ার মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মুক্তির চেতনা জাগিয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশমাতৃকার টানে ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেক সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেশখলায় অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অবস্থান করেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সহযোগিতা এবং যুদ্ধের প্রস্তুতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তদারকির জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলে আব্দুল হেকিম চৌধুরীকে আহ্বায়ক এবং ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেককে সদস্য সচিব করা হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।
কেন্দুয়া, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, যুদ্ধ পরিচালনায় সহযোগিতা করা এবং আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা প্রদান—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
একজন চিকিৎসক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যুদ্ধের ময়দানে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা প্রদান করে তিনি তাঁদের সুস্থ করে আবারও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করেন। চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি হয়ে ওঠেন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।

১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেকের কর্মযজ্ঞ থেমে থাকেনি। রাজনীতির পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান। মানুষের অধিকার, কল্যাণ ও এলাকার উন্নয়নের জন্য তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যান।

তিনি ১১ নম্বর চিরাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি এলাকার মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নে কাজ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত।

কর্মময় ও বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮৯ সালের ২৪ অক্টোবর। ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ডেন্টা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
তাঁর মৃত্যু ছিল কেন্দুয়াবাসীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি যেমন মানুষের সেবা করেছেন, তেমনি একজন রাজনৈতিক সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

ডা. সৈয়দ আব্দুল খালেকের জীবন ছিল দেশপ্রেম, মানবসেবা ও রাজনৈতিক আদর্শের এক অনন্য সমন্বয়। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা, মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই ছিল দেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিত।
আজ তাঁর ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছে তাঁর পরিবার, স্বজন, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী ও এলাকাবাসী। তাঁর কর্মময় জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম ও মানুষের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *