অবশেষে নড়েচড়ে বসলো প্রাণিসম্পদ, পঁচা মাংসের নমুনা সংগ্রহ
মাটির নিচে পুঁতে রাখা মাংস প্রায় ১০ দিন পরও কেন এতটা অক্ষত—এ প্রশ্নে তোলপাড় চলছে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা জুড়ে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস এনে কেন্দুয়া পৌরশহরে বিক্রির অভিযোগ ওঠার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে নড়েচড়ে বসে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর)
মাটির নিচে পুঁতে রাখা আলোচিত মাংসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এখন ল্যাব পরীক্ষার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ উঠেছে, ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার সনাটি ইউনিয়নের আকালপাড়া গ্রামের প্রবাস চন্দ্র সূত্রধরের একটি গরু লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে গরুটিকে গোয়ালঘরে জবাই করে এক দালালের মাধ্যমে কেন্দুয়া পৌরশহরের মাংস ব্যবসায়ী আরাধনের কাছে বিক্রি করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পেলে কেন্দুয়া ও গৌরীপুরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগের বিষয়ে আরাধন সংবাদ সম্মেলন করে মাংস কেনার কথা স্বীকার করেন। তার দাবি, এক দালালের মাধ্যমে তিনি আলোচিত গরুর প্রায় ৫০ কেজি মাংস ৬ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। পরে গরুটির মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরে মাংস মাটিতে পুঁতে রাখেন। এরপর গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে মাটির নিচ থেকে মাংস তুলে দেখানো হয়। সেই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মাংসের প্রকৃত অবস্থা ও সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা হলে ১২ সেপ্টেম্বর মাটির নিচ থেকে উত্তোলনের পরও মাংসের এমন অবস্থা কীভাবে সম্ভব? মাংসের রংও ছিল অস্বাভাবিকভাবে সাদা। বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, ‘২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা হিসেবে ১২ সেপ্টেম্বর মাটির নিচ থেকে মাংস উত্তোলন করা হলে সাধারণত সেটি আরও পচে যাওয়ার কথা। মাংসের রং ও অবস্থা দেখে কিছুটা সংশয় তৈরি হয়েছে। মাংসটি আগে ফ্রিজিং করা হয়েছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা মাংসের নমুনা সংগ্রহ করেছি। তা ল্যাবে পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই মাংসের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
আলোচিত এই ঘটনার মধ্যেই কেন্দুয়ার মাংসের বাজারের তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দুয়া পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রায় এক ডজন মাংসের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১০টি গরু ও ছাগল জবাই করা হয়। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিনে জবাইয়ের সংখ্যা আরও বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়ম অনুযায়ী, পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সুস্থতার ছাড়পত্র দেওয়ার কথা। কিন্তু কেন্দুয়ার বাজারগুলোতে এ কার্যক্রম নিয়মিত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জবাই করা পশু অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত ছিল কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই থাকছে না ক্রেতাদের।
কেন্দুয়া বাজারের মাংস ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরা গরুর মাংস বিক্রির যে অভিযোগ ছড়িয়েছে, ওই ব্যবসায়ী আমার ভাই। তিনি মূলত খাসির মাংসের ব্যবসা করেন এবং মাঝে মধ্যে গরু জবাই করেন। শনিবার সাংবাদিক ও পশু হাসপাতালের লোকজনের সামনে মাটির নীচে পুঁতে রাখা মাংস উত্তোলন করে সবাইকে দেখানো হয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মতিউর রহমান বলেন, ‘কোনো মাংস ব্যবসায়ীরই লাইসেন্স নেই। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত জনবল আমাদের নেই। আমরা বিভিন্ন সময় মাংস ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি। তবে অনেকেই ব্যস্ততার অজুহাতে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চান না।’
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত পশুর মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘আমরা সরল বিশ্বাসে মাংসের দোকান থেকে মাংস কিনি। যদি কোনো ব্যবসায়ী অসুস্থ বা মৃত পশুর মাংস বিক্রি করেন, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান ভূইয়া মজুন বলেন, ‘বিষয়টি কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক সানজিদা চৌধুরী বলেন, ‘আলোচিত বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।
তবে ল্যাবে পাঠানো মাংসটি প্রবাস চন্দ্র সূত্রধরের সেই গরুরই মাংস কি না, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
