পাকা তালের ঘ্রাণে ফিরেছে শৈশব, ক্ষেতলালের ঘরে ঘরে পিঠার আয়োজন
মেঠোপথ ধরে হাঁটলেই নাকে আসছে মিষ্টি এক ঘ্রাণ। কোথাও উঠানে বসে তাল ছাড়ানো হচ্ছে, কোথাও বড় হাঁড়িতে চলছে তালের রস ছেঁকে নেওয়ার কাজ। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে তালের বড়া ভাজার ঘ্রাণ। ভাদ্রের শেষভাগে এমনই এক চেনা আবহে ফিরেছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের গ্রামগুলো। পাকা তালের মৌসুম ঘিরে ঘরে ঘরে এখন চলছে নানা রকম পিঠা-পায়েস তৈরির আয়োজন।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনা, মেঠোপথ ও ফসলের মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলোতে পাক ধরেছে তাল। অনেক গাছ থেকে পাকা তাল পড়ে আছে নিচে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সেগুলো কুড়িয়ে নিচ্ছে। কেউ আবার গাছ থেকে তাল নামিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। এরপর শুরু হচ্ছে তাল থেকে রস বের করে সুস্বাদু খাবার তৈরির আয়োজন।
তালের রস দিয়ে তৈরি হচ্ছে তালের বড়া, রুটি, পায়েশসহ নানা ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্ন। পরিবারের নারী সদস্যদের ব্যস্ততা বেশি হলেও এসব খাবারের অপেক্ষায় থাকেন বাড়ির ছোট-বড় সবাই। তালের তৈরি খাবারের ঘ্রাণে অনেকের মনে পড়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা।
বানাইচ গ্রামের সোলেমান আলী বলেন, একসময় তাল পাকার মৌসুমে গ্রামের ছেলেরা দল বেঁধে রাতের বেলায় গাছের নিচে তাল কুড়াতেন। সকালে বাড়িতে এনে তাল পাড়ার পর শুরু হতো রস বের করার কাজ। এখনো কিছু পরিবার সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তবে আগের তুলনায় তালগাছ অনেক কমে গেছে।
একই গ্রামের বাচ্চু সাখিদারসহ স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও গ্রামের রাস্তা, বাড়ির সীমানা ও জমির আইলে অসংখ্য তালগাছ দেখা যেত। সময়ের সঙ্গে অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন করে তালগাছ লাগানোর প্রবণতাও কমেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে তাল পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। বাজারেও বাড়ছে এর দাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে পাকা তাল শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে গ্রামীণ জীবনের নানা স্মৃতি। বৃষ্টিভেজা বিকেল, কাদামাটির উঠান, পরিবারের সবাই মিলে তাল ছাড়ানো, রান্নাঘরে তালের বড়া তৈরি সব মিলিয়ে পাকা তাল যেন গ্রামবাংলার পুরোনো দিনের একটি জীবন্ত স্মৃতি।
তবে এই ঐতিহ্যের আড়ালে রয়েছে উদ্বেগও। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, তালগাছ কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু একটি ফলের সংকট হিসেবে দেখলে হবে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষেত্রেও তালগাছের গুরুত্ব রয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও তালগাছের ভূমিকার কথা বলা হয়।
তাই পুরোনো তালগাছ রক্ষার পাশাপাশি নতুন করে তালবীজ ও চারা রোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার দুই পাশ, জমির আইল ও বিভিন্ন পতিত জায়গায় পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো গেলে কয়েক বছর পর আবারও গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্য ফিরে আসতে পারে।
ভাদ্রের বিদায়ী বাতাসে ক্ষেতলালের গ্রামগুলোতে এখন পাকা তালের মিষ্টি ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণ শুধু মৌসুমি ফলের আগমনী বার্তা নয়; এর সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে বাংলার মাটির গন্ধ, পারিবারিক বন্ধন আর হারিয়ে যেতে বসা শৈশবের গল্প।
তালের মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। পিঠার আয়োজনও থেমে যাবে। কিন্তু তালগাছের সারি যদি হারিয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে এই ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু প্রজন্মের স্মৃতিও। তাই পাকা তালের এই মৌসুমে নতুন করে তালগাছ রোপণের উদ্যোগই হতে পারে পুরোনো সেই গ্রামীণ ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ।
