র্যাবের নাম বদলে যাচ্ছে, সংসদে বিল
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভাপতিত্ব করেন স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিলে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন।
পুলিশের আওতায় বিশেষায়িত ইউনিট
বিলের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে।’
সরকার প্রয়োজনের নিরিখে পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করবে।
যেসব দায়িত্ব পালন করবে এসআরবি
বিলের ১০ ধারায় এসআর-এর দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও থাকবে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশ অনুসারে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে ইউনিটটি।
তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা
বিলের ১২ ধারায় এসআরবি-কে কোনও স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইনের বিধান প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে হবে।
১৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘তল্লাশি, আটক, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার যে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলি রয়েছে, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন—এমন ইউনিটের কর্মকর্তা তা প্রয়োগ করতে পারবেন।’
তবে গ্রেফতার বা আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবি-এর কাছে আটকে রাখা যাবে না। বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, “গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে বা জব্দকৃত আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করবেন।” একই সঙ্গে এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
ফৌজদারি মামলার তদন্ত করতে পারবে
আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনও সময় এসআরবি মহাপরিচালককে কোনও ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনও সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন।
তদন্তের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবি-এর হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকার কথাও বিলে বলা হয়েছে।
সদস্যদের যেসব কাজ শৃঙ্খলা লঙ্ঘন
বিলের ১৭ ধারায় এসআরবি সদস্যদের বিভিন্ন শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত বা অসদাচরণ করা, অনুমতি ছাড়া গার্ড, চৌকি বা পেট্রোল ত্যাগ করা, আটক বা গ্রেফতার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য করা রয়েছে।
এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম ক্ষতি বা হারানো, অসুস্থতার ভান করা, বলপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকাকেও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি ৭ দিনে প্রতিবেদন
কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে তাকে আটক করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। তবে আটকাদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং আটক সদস্যকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে।
কোনও সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন অন্তর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে। আর “আটককৃত সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনও প্রমাণ না থাকিলে তাহাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হইবে।”
শাস্তি হিসেবে বরখাস্ত, অপসারণ, অবসর ও পদাবনতি
এসআরবি সদস্যদের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের জন্য গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, সর্বোচ্চ এক বছরের জ্যেষ্ঠতা বা বেতন-ভাতা বাজেয়াপ্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করার বিধান রয়েছে।
লঘুদণ্ড হিসেবে অনূর্ধ্ব এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা, তিরস্কার, অনূর্ধ্ব ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ডে আটক, অনূর্ধ্ব ৩০ দিনের জন্য ব্যাটালিয়নে আটক রেখে অতিরিক্ত ড্রিল, গার্ড বা অন্য দায়িত্ব এবং দৈনিক দুই ঘণ্টা করে সর্বোচ্চ ১৪ দিনের জন্য শাস্তিমূলক ড্রিলের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনও সদস্যকে এসব শাস্তি দেওয়া যাবে না।
শাস্তির বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল
বিভাগীয় কার্যধারায় দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের আদেশের বিরুদ্ধে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে এবং মহাপরিচালকের আদেশের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে আপিল করা যাবে। আপিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
