মূল কন্টেন্টে যান
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘে গণতন্ত্র ও পানির অধিকার তুলে ধরেছিলেন খালেদা জিয়া

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পঠিত: ১ বার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেয়া তার প্রথম ভাষণে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরার পাশাপাশি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর অধিকার সুরক্ষা এবং আরও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দারিদ্র্য মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন পরস্পরকে শক্তিশালী করে।’ উন্নয়নশীল বিশ্বে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে লালন করতে উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, পুঁজির স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতাসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি বাংলাদেশ এককভাবে উন্নয়নের কাজ সম্পন্ন করতে পারে না।

তিনি বলেন, ‘সম্পদের সীমাবদ্ধতায় আমরা যখন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি, তখন একা এই কঠিন কাজ সম্পন্ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়; আমাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মানবাধিকার, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে যুক্ত করেন। উদীয়মান শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এসব সুরক্ষায় জাতিসংঘকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সুসংহত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’

তিনি বৃহৎ ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি নদীর পানিবণ্টন, সমুদ্র আইন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং শরণার্থী, অর্থনৈতিক অভিবাসী ও বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের মর্যাদা ও অবস্থানের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের এখতিয়ার সর্বজনীনভাবে গ্রহণের আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া প্রযুক্তি ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের আহ্বান জানিয়ে বলেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক প্রযুক্তিগত ব্যবধান দূর করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ চাই।’ প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তথ্যপ্রবাহের ওপর বিধিনিষেধ একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নত দেশগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি।
তিনি বলেন, শিল্পোন্নত দেশগুলো পরিবেশদূষণের জন্য প্রধানত দায়ী। তাই পরিবেশগত ক্ষতি নিরসনের ব্যয় তাদেরই বহন করা উচিত। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্পদ অনেক কম এবং দূষণে তাদের অবদানও তুলনামূলকভাবে সামান্য।

তিনি বাংলাদেশের পাটশিল্পের বিষয়টিও তুলে ধরেন। খালেদা জিয়া বলেন, রাসায়নিক ও কৃত্রিম বিকল্প পণ্যের তুলনায় পাটজাত পণ্য পরিবেশের জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য। তিনি সতর্ক করে বলেন, কৃত্রিম তন্তুর প্রসার পাটশিল্প এবং এর ওপর নির্ভরশীল লাখো মানুষের জীবিকার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শুধু বৈদেশিক সহায়তা কোনো দেশকে স্বনির্ভর করে তুলতে পারে না।

তিনি উন্নত দেশগুলোকে বৈষম্যমূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা দূর করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সমতার ভিত্তিতে উত্তর-দক্ষিণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং উরুগুয়ে রাউন্ডের আলোচনা দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছি।’ উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেরও চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কার, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

তিনি ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি, ২০০০ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য, খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রচেষ্টা এবং দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের মৌলিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে নেয়া ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন।

তিনি স্যানিটেশন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের সম্পৃক্ত করাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়েও কথা বলেন।

আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে সার্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তৎকালীন সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি বলেন, সাত সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদারে তিনি কাজ করছেন। তিনি ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচির পাশাপাশি বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উদ্যোগগুলোর কথাও উল্লেখ করেন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত পানিবণ্টন সমস্যা, বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন, নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানিসম্পদের ওপর বাংলাদেশের ‘অন্তর্নিহিত ও আইনগত অধিকার’ রয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, শুষ্ক মৌসুমে ভারত একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে বাংলাদেশে খরা দেখা দেয়। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য জীবন-মরণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে মরুকরণ, লবণাক্ততা, নৌচলাচলের সক্ষমতা হ্রাস এবং কৃষি, শিল্প ও জীবিকার ক্ষতির যোগসূত্র তুলে ধরেন তিনি।

গঙ্গার পানিসম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে একটি জরুরি ও স্থায়ী চুক্তির আহ্বান জানান খালেদা জিয়া।

তিনি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাংলাদেশের নীতির কথাও তুলে ধরেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে তার প্রথম ভাষণ দেয়ার মধ্য দিয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এ প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার ভাষণটি নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। এরপর খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন। জাতিসংঘের নথিপত্রে ৪৮তম অধিবেশনের ১৩তম পূর্ণাঙ্গ সভায় তার ভাষণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভাষণের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সঙ্গে এ পরিবারের চার দশকেরও বেশি সময়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে। এ ভাষণে তিনি বিশ্ব সংস্থার সামনে বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবেন।

সূত্র: বাসস

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *