পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের উদ্যোগে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক আইন’ শীর্ষক সেমিনার
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:- গত কাল পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের উদ্যোগে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক আইন: বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং টেকসই সমাধান’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হসপিটালের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের সমন্বয়ক মুহাম্মদ কাউছার উল্লাহ। অধ্যক্ষ এম এ আমিন ও মোনতাহিনা জান্নাত স্বর্ণার সঞ্চালনায়, সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের উপদেষ্টা তৌহিদুল ইসলাম, সিসিপিসি এর সহকারি অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, চবির সহকারি অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান, মরুফ আহমেদ, সিনিয়র সাংবাদিক কামাল পারভেজ, আবুবকর ছিদ্দিকসহ অনেকেই বক্তব্য রাখেন।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এই অঞ্চলের শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সকল জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিভাজনমূলক রাজনীতি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা যেন পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিভিন্ন বিষয় পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, “নাগরিকত্ব কোনো জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের মূলনীতি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের উপদেষ্টা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চল। এ অঞ্চলের ইতিহাস, জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বাস্তবতা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা প্রয়োজন।
সেমিনারের সভাপতি ও পাঠশালা সিএইচটি রিসার্চ সেলের সমন্বয়ক মুহাম্মদ কাউছার উল্লাহ তাঁর বক্তব্যে ‘উপজাতি’ ও ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার এবং এর আইনগত ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, “উপজাতি ও আদিবাসী শব্দ দুটি সমার্থক নয়। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়।
তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) Convention 107 ও Convention 169-এর আলোকে ‘indigenous’ ও ‘tribal’ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে এবং তাঁর মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
মুহাম্মদ কাউছার উল্লাহ বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস ও আদিনিবাস নিয়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক রয়েছে, সেটি আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস, আইন ও গবেষণার আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিভিন্ন বিধানের ফলে পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। তাই টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে চুক্তির বিভিন্ন দিক পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সেমিনারে বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য তথ্যভিত্তিক গবেষণা, ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং দায়িত্বশীল আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে জাতিগত পরিচয়, নাগরিক অধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগিয়ে নেওয়া হয়—এমন মতও উঠে আসে।
সেমিনারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
